বাড়ির একটি রুমের মেঝে নতুন করে টাইলস করানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর প্রথম যে প্রশ্নটা আসে, সেটা হলো—২০০ বর্গফুট জায়গার জন্য আসলে কতগুলো টাইলস কিনতে হবে? শুধু ২০০ বর্গফুটকে টাইলসের মাপ দিয়ে ভাগ করলেই কি সঠিক সংখ্যা পাওয়া যায়?
বাস্তবে বিষয়টা একটু আলাদা। কারণ টাইলস কাটতে গিয়ে কিছু অংশ বাদ যায়, আবার পরিবহনের সময় বা কাজের সময় দু-একটি টাইলস ভেঙেও যেতে পারে। একই সঙ্গে দোকানে টাইলসের দাম অনেক সময় প্রতি বর্গফুট হিসেবে বলা হয়, আবার কোথাও প্রতি বক্সের দাম দেওয়া থাকে। ফলে শুধু টাইলসের সংখ্যা জানলেই মোট বাজেট ঠিক করা যায় না।
ধরুন, আপনার একটি ঘরের মেঝের আয়তন ২০০ বর্গফুট। আপনি ২৪×২৪ ইঞ্চি টাইলস ব্যবহার করতে চান। এখন কতটি টাইলস লাগবে, কত বক্স কিনতে হবে এবং টাইলসের পেছনে আনুমানিক কত টাকা খরচ হতে পারে—এই হিসাবটা বাস্তবভাবে কীভাবে করবেন, সেটাই এখানে দেখানো হলো।
২০০ বর্গফুট জায়গার হিসাব করার আগে যে ভুলটা করবেন না
অনেকে ঘরের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের হিসাব করেই দোকানে গিয়ে টাইলস কিনে ফেলেন। কিন্তু ঘরের পুরো মেঝে যদি আয়তাকার না হয়, কিংবা দরজার অংশ, কলাম, সিঁড়ির মুখ বা অন্য কোনো জায়গা থাকে, তাহলে সরাসরি মোট মাপ ধরে কেনাকাটা করলে হিসাব গরমিল হতে পারে।
তাই প্রথমে মেঝের প্রকৃত ব্যবহারযোগ্য জায়গাটা মাপুন। বড় ঘর হলে দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ কয়েক জায়গায় মেপে দেখুন। কারণ পুরোনো বাড়িতে দেয়াল পুরোপুরি সোজা না হওয়ায় এক প্রান্তের মাপ আরেক প্রান্তের সঙ্গে সামান্য আলাদা হতে পারে।
২০০ বর্গফুটের জন্য ২৪×২৪ ইঞ্চি টাইলস ধরলে হিসাব কেমন হয়?
ধরা যাক, আপনার ঘরের মেঝে ২০০ বর্গফুট এবং আপনি ২৪×২৪ ইঞ্চি অর্থাৎ ২×২ ফুটের টাইলস ব্যবহার করবেন। একটি টাইলস তখন ৪ বর্গফুট জায়গা ঢাকে।
এই অবস্থায় কাগজে-কলমে প্রয়োজনীয় টাইলসের সংখ্যা হবে ২০০ ÷ ৪ = ৫০টি।
কিন্তু এখানেই কেনাকাটার হিসাব শেষ করা ঠিক হবে না। কারণ বাস্তবে ৫০টি টাইলস কিনলে কাজের সময় কোনো টাইলস কাটার কারণে নষ্ট হলে বা ভেঙে গেলে অতিরিক্ত টাইলসের প্রয়োজন হতে পারে।
অতিরিক্ত টাইলস কেন রাখা হয়?
টাইলস বসানোর সময় সবগুলো টাইলস পুরো অবস্থায় ব্যবহার করা যায় না। দেয়ালের পাশে, দরজার কাছে কিংবা কোণায় মাপ অনুযায়ী টাইলস কাটতে হয়। কাটা অংশের কিছু অংশ আর অন্য জায়গায় ব্যবহার করা সম্ভব হয় না।
এ ছাড়া টাইলসের বাক্স খোলার পর কোনো টাইলসে চিড় দেখা যেতে পারে। মিস্ত্রির কাটিংয়ের সময়ও কোনো টাইলস নষ্ট হতে পারে। একই ডিজাইনের টাইলস পরে বাজারে না-ও পাওয়া যেতে পারে।
এই কারণেই সাধারণত প্রয়োজনের তুলনায় কিছু অতিরিক্ত টাইলস রাখা নিরাপদ। কত শতাংশ অতিরিক্ত রাখা উচিত, সেটা ঘরের আকৃতি, টাইলসের সাইজ এবং ডিজাইনের ওপর নির্ভর করে। সোজা আয়তাকার ঘরে অপচয় কম হতে পারে, কিন্তু অনেক কোণা বা জটিল কাটিং থাকলে বাড়তি টাইলসের প্রয়োজনও বাড়তে পারে।
তাহলে ২০০ বর্গফুটের জন্য কতটা বাড়তি ধরবেন?
ধরা যাক, আপনি হিসাবের সুবিধার জন্য ৮ শতাংশ অতিরিক্ত রাখলেন। ২০০ বর্গফুটের ৮ শতাংশ হলো ১৬ বর্গফুট। অর্থাৎ কেনার পরিকল্পনায় মোট প্রায় ২১৬ বর্গফুট টাইলস ধরে এগোনো যায়।
যদি ২×২ ফুটের একটি টাইলস ৪ বর্গফুট জায়গা ঢাকে, তাহলে ২১৬ বর্গফুটের জন্য প্রয়োজন হবে প্রায় ৫৪টি টাইলস।
এখানে ৫৪টি হলো পরিকল্পনার হিসাব। দোকানে টাইলস সাধারণত একেকটি করে নয়, বক্স হিসেবে বিক্রি হয়। তাই শেষ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একটি বক্সে কয়টি টাইলস এবং মোট কত বর্গফুট টাইলস থাকে, সেটি অবশ্যই দেখে নিতে হবে।
বক্স হিসেবে টাইলস কিনলে হিসাবটা কীভাবে মিলাবেন?
এখানেই অনেকের সঙ্গে দোকানির হিসাবের পার্থক্য তৈরি হয়। ধরুন, কোনো টাইলসের এক বক্সে ৪টি টাইলস রয়েছে এবং প্রতিটি টাইলস ২×২ ফুট। তাহলে এক বক্সে মোট ১৬ বর্গফুট টাইলস থাকবে।
আপনার প্রয়োজন যদি প্রায় ২১৬ বর্গফুট হয়, তাহলে ২১৬ ÷ ১৬ = ১৩.৫ বক্স। যেহেতু অর্ধেক বক্স কিনে কাজ চালানো সম্ভব নাও হতে পারে, তাই বাস্তবে ১৪ বক্স নিতে হবে।
তবে সব ব্র্যান্ড বা সাইজের ক্ষেত্রে এক বক্সে একই পরিমাণ টাইলস থাকে না। তাই শুধু বক্সের সংখ্যা দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে বাক্সের গায়ে লেখা মোট কভারেজ দেখে হিসাব করাই নিরাপদ।
এবার টাইলসের খরচ বের করি
ধরা যাক, আপনি যে টাইলসটি পছন্দ করেছেন সেটির দাম প্রতি বর্গফুট ৭০ টাকা। আপনার পরিকল্পিত কেনাকাটা যদি ২১৬ বর্গফুট হয়, তাহলে শুধু টাইলসের আনুমানিক দাম হবে:
২১৬ × ৭০ = ১৫,১২০ টাকা
অর্থাৎ এই উদাহরণে টাইলস কিনতেই প্রায় ১৫ হাজার ১২০ টাকা লাগতে পারে।
কিন্তু এটাকে পুরো ফ্লোরের কাজের খরচ ভাবলে ভুল হবে। কারণ টাইলস কেনার পাশাপাশি মিস্ত্রির শ্রম, সিমেন্ট বা আঠা, বালু, গ্রাউট, পুরোনো মেঝে ভাঙার খরচ এবং পরিবহন খরচ আলাদা হতে পারে।
শুধু টাইলসের দাম দেখলে বাজেট কেন ভুল হয়?
ধরুন দোকানি বললেন, টাইলস ৭০ টাকা বর্গফুট। আপনি ২০০ বর্গফুটের হিসাব করে ১৪ হাজার টাকা ধরে ফেললেন। কিন্তু পরে দেখা গেল বাড়তি টাইলস নিতে হয়েছে, পরিবহন খরচ আছে এবং মিস্ত্রির পারিশ্রমিকও যোগ হয়েছে। তখন মোট বাজেট আগের হিসাবের চেয়ে বেশ কিছুটা বেড়ে যেতে পারে।
তাই টাইলসের কাজের বাজেট করার সময় অন্তত চারটি খরচ আলাদা করে লিখে রাখা ভালো—টাইলস, বসানোর শ্রম, প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী এবং পরিবহন। এতে দোকানে যাওয়ার আগেই আপনার হাতে একটি বাস্তবসম্মত বাজেট থাকবে।
দোকানে যাওয়ার আগে এই ছোট হিসাবটা করে নিন
আমি হলে টাইলস কিনতে যাওয়ার আগে মোবাইলে একটি ছোট নোট করে রাখতাম। সেখানে থাকত—মেঝের মোট আয়তন, টাইলসের সাইজ, কত শতাংশ বাড়তি রাখছি, প্রতি বর্গফুটের দাম এবং এক বক্সে কত বর্গফুট টাইলস আছে।
আর হিসাবটা হাতে করতে না চাইলে টাইলসের প্রয়োজনীয় পরিমাণ হিসাব করার ক্যালকুলেটরটি ব্যবহার করে প্রাথমিক হিসাব বের করে নিতে পারেন। এরপর দোকানের বক্সের কভারেজের সঙ্গে মিলিয়ে নিলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে।
একই ঘরে টাইলস বদলালে হিসাবও বদলে যাবে
এখানে একটা বিষয় মনে রাখা জরুরি—২০০ বর্গফুট জায়গা একই থাকলেও টাইলসের সাইজ পরিবর্তন করলে প্রয়োজনীয় টাইলসের সংখ্যা বদলে যাবে। ছোট টাইলস হলে সংখ্যায় বেশি লাগবে, বড় টাইলস হলে সংখ্যায় কম লাগবে। কিন্তু মোট কভার করা জায়গার হিসাব একই থাকবে।
আবার বড় সাইজের টাইলস ব্যবহার করলে কাটিংয়ের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়। ঘরের দৈর্ঘ্য বা প্রস্থ যদি টাইলসের মাপের সঙ্গে ভালোভাবে না মেলে, তাহলে প্রান্তের অংশে বেশি কাটিং লাগতে পারে। তাই শুধু টাইলসের সংখ্যা নয়, ঘরের আকৃতিও বিবেচনায় নিতে হবে।
মিস্ত্রিকে কাজ দেওয়ার সময় একটি বিষয় পরিষ্কার করে নিন
টাইলস বসানোর আগে মিস্ত্রির সঙ্গে কথা বলে জেনে নিন শ্রমের হিসাব কীভাবে হবে। কেউ প্রতি বর্গফুট হিসেবে দাম নিতে পারেন, আবার কেউ পুরো কাজের জন্য একটি মোট পারিশ্রমিক বলতে পারেন। দেয়াল ও মেঝের কাজ একসঙ্গে হলে দুই ধরনের কাজের রেটও আলাদা হতে পারে।
আর টাইলস কাটার জন্য আলাদা কোনো চার্জ আছে কি না, পুরোনো টাইলস খুলতে কত লাগবে এবং কাজ শেষে ময়লা পরিষ্কারের বিষয়টি কে দেখবে—এসব আগে পরিষ্কার করলে পরে অপ্রত্যাশিত খরচ নিয়ে ঝামেলা কম হয়।
টাইলস কেনার সময় যে ৫টি জিনিস মিলিয়ে দেখবেন
- বক্সে মোট কত বর্গফুট আছে: শুধু কয়টি টাইলস আছে সেটা নয়, মোট কভারেজ দেখুন।
- একই ব্যাচের টাইলস কি না: আলাদা ব্যাচে রঙ বা শেডে সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে।
- ভাঙা বা চিড় আছে কি না: বক্স নেওয়ার আগে সম্ভব হলে প্যাকেটের অবস্থা দেখুন।
- কিছু অতিরিক্ত রাখা হয়েছে কি না: ভবিষ্যতে একটি টাইলস নষ্ট হলে একই ডিজাইন পাওয়া কঠিন হতে পারে।
- বিল ঠিকভাবে নিন: ব্র্যান্ড, মডেল, সাইজ, বক্সের সংখ্যা এবং দাম লিখে রাখা থাকলে পরে হিসাব মিলানো সহজ হয়।
একটা বাস্তব বাজেটের উদাহরণ
ধরা যাক, ২০০ বর্গফুটের একটি ঘরে আপনি এমন টাইলস বসাবেন যার দাম ৭০ টাকা প্রতি বর্গফুট। কাটিং ও সম্ভাব্য অপচয়ের জন্য পরিকল্পনায় ২১৬ বর্গফুট ধরেছেন। তাহলে টাইলসের দাম দাঁড়াল প্রায় ১৫,১২০ টাকা।
এর সঙ্গে যদি পরিবহন, আঠা বা অন্যান্য উপকরণ এবং মিস্ত্রির শ্রম যোগ হয়, তাহলে মোট বাজেট আরও বাড়বে। তাই দোকান থেকে শুধু “প্রতি বর্গফুট কত?” জেনে ফিরে না এসে পুরো কাজ শেষ করতে আনুমানিক কত টাকা লাগবে, সেটাই আপনার আসল বাজেট হওয়া উচিত।
আর একটি বিষয়—উপরের দামটি শুধু বোঝানোর জন্য উদাহরণ হিসেবে ধরা হয়েছে। আপনার এলাকার বাজার, ব্র্যান্ড, ডিজাইন ও টাইলসের মান অনুযায়ী দাম অনেকটাই আলাদা হতে পারে। কেনার দিনকার দোকানের দর দিয়েই চূড়ান্ত হিসাব করবেন।
কেনার আগে শেষবার হিসাব মিলিয়ে নিন
২০০ বর্গফুটের ঘরের জন্য ২০০ বর্গফুট টাইলস কিনলেই কাজ শেষ হয়ে যাবে—এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ঘরের আকৃতি, টাইলসের সাইজ, কাটিং এবং ভাঙার সম্ভাবনা বিবেচনায় কিছু অতিরিক্ত রাখা দরকার। এরপর সেই পরিমাণকে বক্সের কভারেজের সঙ্গে মিলিয়ে পূর্ণ বক্স হিসেবে কেনার পরিকল্পনা করতে হবে।
সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হলো আগে মেঝের মাপ নিশ্চিত করা, তারপর টাইলসের সাইজ ও প্রতি বক্সের কভারেজ দেখে হিসাব করা এবং সবশেষে দোকানের বর্তমান দাম দিয়ে বাজেট মিলিয়ে নেওয়া। এতে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি টাইলস কেনার ঝুঁকিও কমে, আবার কাজের মাঝপথে টাইলস শেষ হয়ে যাওয়ার সমস্যাও এড়ানো যায়।
মন্তব্য (0 টি)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!