কেউ মারা গেলে তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি কার কতটুকু হবে—এই প্রশ্নের উত্তর শুধু আত্মীয়তার সম্পর্ক দেখে দেওয়া যায় না। এই হিসেব করতে গেলে অনেক বিষয়ে জানতে এবং বুঝতে হয়,কে জীবিত আছেন, মৃত ব্যক্তির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কী, অন্য কোনো উত্তরাধিকারী আছেন কি না—এসব বিষয়ের ওপর হিসাব বদলে যেতে পারে, তাই সঠিক নিয়ম জানা আমাদের সকলের জন্যই অতিব জরুরী বলে আমি মনে করি। আর ইসলামী উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় এই হিসাবকে বলা হয়
ফারায়েজ।
ফারায়েজের বিষয়টি প্রথমবার পড়লে অনেকের কাছে জটিল মনে হয়। বিশেষ করে স্বামী বা স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, বাবা-মা এবং ভাই-বোন একসঙ্গে থাকলে কোন উত্তরাধিকারী কত অংশ পাবেন, কে পাবেন না এবং কোন অংশ আগে নির্ধারণ করতে হবে,এসব নিয়ে সহজেই ভুল হতে পারে। তাই আমাদের উচিত এই ফারায়েজ এর নিয়ম ও হিসেব সম্পর্কে ধাপে ধাপে জানা। আসলে ধাপে ধাপে শিখলে সেটার কার্যকারিতা একটু বেশিহয়ে থাকে।
তাই আমি এই লেখায় কোনো একটি পরিবারের সম্পত্তির হিসাব মুখস্থ করানোর বদলে ফারায়েজ হিসাব করার পদ্ধতিটাই হাতে-কলমে দেখাবো, যাতে করে আপনাদের ফারায়েজের হিসেবের বিষয় টি একেবারে পরিষ্কার হয়। একটি মৃত্যু ঘটার পর কীভাবে সম্পত্তির হিসাব শুরু করবেন, কোন বিষয়গুলো আগে বাদ যাবে, উত্তরাধিকারী কীভাবে শনাক্ত করবেন, ভগ্নাংশ কীভাবে বুঝবেন এবং শেষ পর্যন্ত সম্পত্তি কীভাবে ভাগে পৌঁছাবে—সবকিছু আমি উদাহরণসহ তুলে ধরার চেষ্টা করেছি,আশাকরি মনোযোগ সহকারে বোঝার চেষ্টা করবেন। তো আমরা প্রথমেই ফারায়েজ সম্পর্কে একটু জানবো।
ফারায়েজ কী?
ফারায়েজ হলো ইসলামী বিধান অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে যোগ্য উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য অংশ নির্ধারণের পদ্ধতি। এখানে “যোগ্য উত্তরাধিকারী” কথাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুধু আত্মীয় হলেই প্রত্যেক ব্যক্তি মৃতের সম্পত্তিতে অংশ পাবেন—এমন নয়।
একজন মৃত ব্যক্তির ছেলে থাকতে পারেন, মেয়ে থাকতে পারেন, বাবা-মা থাকতে পারেন, স্ত্রী থাকতে পারেন, আবার ভাই-বোনও থাকতে পারেন। কিন্তু সবাই একই পরিস্থিতিতে উত্তরাধিকারী হিসেবে অংশ পাবেন না। কাছের কিছু উত্তরাধিকারী উপস্থিত থাকলে দূরের কোনো উত্তরাধিকারী হিসাব থেকে বাদ পড়তে পারেন। তাই আগে উত্তরাধিকারীদের তালিকা তৈরি করা হয়, তারপর তাদের সম্পর্ক ও প্রাপ্য অংশ বিবেচনা করা হয়।
ফারায়েজ হিসাব শুরু করার আগে একটি বিষয় পরিষ্কার জানুন
ফারায়েজের হিসাব শুরু করার আগে পুরো সম্পত্তিকে সরাসরি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া ঠিক নয়। মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পত্তির ক্ষেত্রে প্রথমে কিছু বিষয় নিষ্পত্তি করতে হয়। এরপর যে সম্পত্তি উত্তরাধিকার হিসেবে বণ্টনযোগ্য থাকে, সেটিই ফারায়েজের হিসাবের ভিত্তি হয়।
সহজভাবে বিষয়টি এভাবে মনে রাখতে পারেন:
মৃত্যু → দাফন-কাফনের প্রয়োজনীয় খরচ → দেনা পরিশোধ → বৈধ ওসিয়ত → অবশিষ্ট সম্পত্তি → উত্তরাধিকারীদের অংশ নির্ধারণ
তবে বাস্তব কোনো সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে দেনা, ওসিয়ত, যৌথ মালিকানা, দলিল এবং প্রযোজ্য আইনসহ অন্যান্য বিষয় যাচাই করা দরকার। তাই এই ধারাটিকে শেখার কাঠামো হিসেবে দেখুন, নির্দিষ্ট মামলার আইনি সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়।
প্রথম ধাপ: মৃত ব্যক্তির মোট সম্পত্তি বের করুন
ধরুন একজন ব্যক্তি মৃত্যুর সময় রেখে গেলেন:
- একটি বাড়ি
- ২টি জমি
- ব্যাংকে থাকা টাকা
- নগদ অর্থ
- স্বর্ণ বা অন্যান্য মূল্যবান সম্পদ
- ব্যবসায় তার মালিকানার অংশ
এসবকে আলাদা আলাদা না দেখে প্রথমে সম্পত্তির প্রকৃতি ও মালিকানা পরিষ্কার করতে হবে। কোনো সম্পত্তি যদি অন্য কারও সঙ্গে যৌথ মালিকানায় থাকে, তাহলে পুরো সম্পত্তিকে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি ধরে নেওয়া যাবে না। মৃত ব্যক্তির নিজের অংশ কতটুকু ছিল, সেটি আগে নির্ধারণ করতে হবে।
একইভাবে কারও কাছে পাওনা টাকা থাকলে সেটিও মৃত ব্যক্তির সম্পদের অংশ হতে পারে। আবার মৃত ব্যক্তির নিজের দেনা থাকলে সেটি আলাদা করে হিসাব করতে হবে, এবং মোট সম্পত্তি থেকে সেটি মিটিয়ে দিতে হবে।
দ্বিতীয় ধাপ: দাফন-কাফনের প্রয়োজনীয় খরচ
মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার দাফন-কাফনের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় খরচ থাকলে সেটি সম্পত্তির হিসাবের আগে বিবেচনা করা হয়। এখানে অপ্রয়োজনীয় বা ব্যক্তিগত খরচকে মৃতের সম্পত্তির ওপর চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়টি আলাদা। বাস্তব ক্ষেত্রে খরচের প্রকৃতি যাচাই করা জরুরি।
তৃতীয় ধাপ: মৃত ব্যক্তির দেনা খুঁজে বের করুন
ফারায়েজের হিসাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো দেনা। মৃত ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় কারও কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে থাকলে, কোনো বকেয়া পাওনা থাকলে বা পরিশোধযোগ্য আর্থিক দায় থাকলে তা উপেক্ষা করে সরাসরি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি ভাগ করা ঠিক নয়।
ধরুন মৃত ব্যক্তির মোট সম্পদের মূল্য ১২ লাখ টাকা। কিন্তু তার বৈধ দেনা ২ লাখ টাকা। তাহলে ১২ লাখ টাকাকেই সরাসরি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ভাগ করার উদাহরণ দেওয়া যাবে না। আগে সংশ্লিষ্ট দায় বিবেচনায় নিতে হবে।
এই কারণেই ফারায়েজের হিসাব করার সময় শুধু “মোট সম্পত্তি কত?” জানলেই যথেষ্ট নয়; “মৃত ব্যক্তির কোনো দেনা ছিল কি?”—এই প্রশ্নটিও করতে হবে।
চতুর্থ ধাপ: ওসিয়তের বিষয়টি বুঝুন
মৃত ব্যক্তি কোনো ওসিয়ত করে গেলে সেটিও হিসাবের আগে বিবেচনার বিষয়। ইসলামী উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় ওসিয়তের আলাদা নিয়ম রয়েছে। সাধারণভাবে উত্তরাধিকারীদের নির্ধারিত অংশ পরিবর্তন করার জন্য শুধু ওসিয়তের ওপর নির্ভর করা যায় না এবং বৈধ ওসিয়তের সীমা ও শর্ত আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হয়।
আরো পড়ুনঃ
ভগ্নাংশ যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগ করার সহজ নিয়ম
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা ভালো—ওসিয়ত, হেবা এবং উত্তরাধিকার এক জিনিস নয়। জীবিত অবস্থায় করা হেবা এবং মৃত্যুর পর কার্যকর হওয়ার কথা বলা ওসিয়তের আইনি ও ধর্মীয় অবস্থান এক নয়। তাই দলিল বা বক্তব্যের ধরন না জেনে কোনো সম্পত্তিকে ওসিয়ত ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
এখন আসল ফারায়েজের হিসাব শুরু হবে
দাফন-কাফনের প্রয়োজনীয় খরচ, দেনা এবং প্রযোজ্য ওসিয়তের বিষয় বিবেচনার পর যে সম্পত্তি উত্তরাধিকার হিসেবে বণ্টনযোগ্য থাকে, সেটিই এখন আমাদের মূল হিসাবের সম্পত্তি।
এরপর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো মৃত ব্যক্তির
সব জীবিত উত্তরাধিকারীর তালিকা তৈরি করা।
একটি কাগজে এভাবে লিখতে পারেন:
| সম্পর্ক |
জীবিত? |
বিবাহিত? |
মৃতের সঙ্গে সম্পর্ক |
| স্ত্রী |
হ্যাঁ |
প্রযোজ্য নয় |
স্বামী মারা গেছেন |
| বাবা |
হ্যাঁ |
প্রযোজ্য নয় |
পিতা |
| মা |
হ্যাঁ |
প্রযোজ্য নয় |
মাতা |
| ছেলে |
হ্যাঁ |
প্রযোজ্য নয় |
পুত্র |
| মেয়ে |
হ্যাঁ |
প্রযোজ্য নয় |
কন্যা |
এভাবে তালিকা করলে হিসাবের সময় কোনো সম্পর্ক বাদ পড়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
স্বামী ও স্ত্রীর অংশ কীভাবে বুঝবেন?
মৃত ব্যক্তি পুরুষ হলে তার স্ত্রী উত্তরাধিকারী হিসেবে অংশ পেতে পারেন। আবার মৃত ব্যক্তি নারী হলে তার স্বামীও উত্তরাধিকারী হতে পারেন। কিন্তু স্বামী বা স্ত্রীর অংশ সব পরিস্থিতিতে একই থাকে না। বিশেষ করে মৃত ব্যক্তির সন্তান বা নির্দিষ্ট বংশধর আছে কি না, তার ওপর অংশের পরিবর্তন হতে পারে।
তাই শুধু “স্ত্রী আছে, তাই স্ত্রী এত অংশ পাবেন”—এভাবে মুখস্থ করলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আগে দেখতে হবে মৃত ব্যক্তি সন্তান বা প্রাসঙ্গিক বংশধর রেখে গেছেন কি না এবং অন্য কোন উত্তরাধিকারী জীবিত আছেন।
সন্তান থাকলে হিসাবের ধরন
ছেলে ও মেয়ে দুজনই উত্তরাধিকারী হলে তাদের অংশ নির্ধারণের ক্ষেত্রে ইসলামী ফারায়েজের একটি পরিচিত মূলনীতি হলো একই স্তরে ছেলে ও মেয়ের অংশের অনুপাত। সাধারণ অবস্থায় একজন ছেলে দুইজন মেয়ের অংশের সমান অংশ পায়।
ধরুন, কোনো নির্দিষ্ট হিসাবের ক্ষেত্রে বণ্টনের জন্য শুধু দুই ছেলে ও এক মেয়ে থাকে এবং তাদের মধ্যে বণ্টনের জন্য ৫টি সমান একক তৈরি হয়। তাহলে:
- প্রথম ছেলে = ২ একক
- দ্বিতীয় ছেলে = ২ একক
- মেয়ে = ১ একক
মোট = ৫ একক।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি পুরো সম্পত্তির চূড়ান্ত হিসাব নয়। কারণ কোনো বাস্তব পরিবারের ক্ষেত্রে স্ত্রী, স্বামী, বাবা, মা বা অন্য উত্তরাধিকারী থাকলে আগে তাদের নির্ধারিত অংশ হিসাব করতে হতে পারে। অবশিষ্ট অংশের হিসাব তখন ভিন্নভাবে দাঁড়াবে।
ছেলে-মেয়ের হিসাব হাতে-কলমে
ধরা যাক, একটি উদাহরণে কোনো সম্পত্তির ৫টি সমান অংশ সন্তানদের মধ্যে বণ্টনের জন্য এসেছে। সেখানে ২ ছেলে ও ১ মেয়ে আছে।
তাহলে মোট অংশ:
২ + ২ + ১ = ৫
এখন যদি সন্তানদের জন্য বণ্টনযোগ্য সম্পত্তি ১০ লাখ টাকা হয়, তাহলে এক অংশের মূল্য:
১০,০০,০০০ ÷ ৫ = ২,০০,০০০ টাকা
প্রথম ছেলে পাবেন ২ × ২,০০,০০০ =
৪,০০,০০০ টাকা।
দ্বিতীয় ছেলে পাবেন ২ × ২,০০,০০০ =
৪,০০,০০০ টাকা।
মেয়ে পাবেন ১ × ২,০০,০০০ =
২,০০,০০০ টাকা।
মোট = ৪,০০,০০০ + ৪,০০,০০০ + ২,০০,০০০ =
১০,০০,০০০ টাকা।
এই উদাহরণটি শুধু অনুপাত বোঝানোর জন্য। বাস্তব ফারায়েজের ক্ষেত্রে অন্য নির্ধারিত অংশীদার থাকলে সন্তানদের পাওয়া অবশিষ্ট অংশের পরিমাণ পরিবর্তিত হবে।
বাবা-মা থাকলে কী হবে?
মৃত ব্যক্তির বাবা ও মা জীবিত থাকলে তাদের উপস্থিতি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাবা-মা সরাসরি উত্তরাধিকারী হতে পারেন এবং অন্য উত্তরাধিকারীদের অংশের ওপরও তাদের উপস্থিতির প্রভাব পড়তে পারে।
এখানে শুধু “বাবা আছেন” বা “মা আছেন” লিখলেই হিসাব শেষ হয় না। মৃত ব্যক্তির সন্তান আছে কি না, ছেলে-মেয়ে কারা আছে এবং অন্য নির্ধারিত অংশীদার কারা আছেন—এসব একসঙ্গে দেখতে হয়।
এই কারণেই ফারায়েজ শেখার সময় আলাদা আলাদা আত্মীয়ের অংশ মুখস্থ করার পাশাপাশি
একাধিক উত্তরাধিকারী একসঙ্গে থাকলে হিসাব কীভাবে বদলে যায়, সেটি বোঝা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ভাই-বোন কি সব সময় উত্তরাধিকারী হন?
না। ভাই বা বোন জীবিত থাকলেই তারা প্রত্যেক পরিস্থিতিতে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তির অংশ পাবেন—এমন নয়। মৃত ব্যক্তির সন্তান, বাবা এবং অন্যান্য কাছের উত্তরাধিকারীর উপস্থিতির কারণে ভাই-বোনের উত্তরাধিকার পাওয়ার অবস্থান পরিবর্তিত হতে পারে।
এখানে একটি সাধারণ ভুল হলো, মৃত ব্যক্তির কোনো সন্তান নেই শুনেই ভাই-বোনের মধ্যে সম্পত্তি ভাগ করে দেওয়া। সেটিও যথেষ্ট নয়। বাবা-মা, স্বামী বা স্ত্রী এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক উত্তরাধিকারী জীবিত আছেন কি না, তা আগে দেখতে হবে।
কাছের উত্তরাধিকারী থাকলে দূরের আত্মীয়ের কী হয়?
ফারায়েজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো
হাজব—অর্থাৎ কোনো উত্তরাধিকারীর উপস্থিতির কারণে অন্য কোনো উত্তরাধিকারী সম্পূর্ণভাবে অংশ থেকে বাদ পড়তে পারেন অথবা তার অংশের ধরন পরিবর্তিত হতে পারে।
এই নিয়ম না বুঝে শুধু সম্পর্কের তালিকা দেখে ভাগ করলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো ব্যক্তির ছেলে জীবিত থাকলে তার ভাইয়ের উত্তরাধিকার পাওয়ার প্রশ্নটি সাধারণ পরিস্থিতিতে আগের মতো থাকে না।
তাই ফারায়েজের হিসাবের সময় তিনটি বিষয় পাশাপাশি দেখতে হবে:
- কে কে জীবিত?
- তাদের সঙ্গে মৃত ব্যক্তির সম্পর্ক কী?
- কেউ অন্য কাউকে হিসাব থেকে বাধাগ্রস্ত করছেন কি না?
ফারায়েজের ভগ্নাংশ বুঝবেন কীভাবে?
ফারায়েজের অনেক হিসাব ভগ্নাংশে প্রকাশ করা হয়। যেমন ১/২, ১/৪, ১/৮, ১/৩, ১/৬ ইত্যাদি। এগুলো দেখে ভয় পাওয়ার দরকার নেই। ভগ্নাংশের অর্থ খুব সরল।
ধরুন কোনো সম্পত্তির ১/৪ অংশ কারও প্রাপ্য। তাহলে মোট সম্পত্তিকে ৪টি সমান ভাগে কল্পনা করে তার ১টি ভাগ বোঝানো হচ্ছে।
আবার ১/৮ মানে মোট সম্পত্তির ৮টি সমান ভাগের ১টি।
যদি সম্পত্তির মূল্য ৮ লাখ টাকা হয় এবং কোনো নির্দিষ্ট অংশ ১/৮ হয়, তাহলে:
৮,০০,০০০ ÷ ৮ = ১,০০,০০০ টাকা
অর্থাৎ ১/৮ অংশের মূল্য ১ লাখ টাকা।
ল.সা.গু দিয়ে ফারায়েজের হিসাব সহজ করার কৌশল
একাধিক ভগ্নাংশ একসঙ্গে থাকলে সরাসরি টাকা দিয়ে হিসাব না করে আগে একটি সাধারণ হর তৈরি করা সুবিধাজনক। এজন্য লঘিষ্ঠ সাধারণ গুণিতক বা ল.সা.গু ব্যবহার করা যায়।
ধরুন কোনো উদাহরণে দুটি অংশ ১/৪ এবং ১/৬। ৪ ও ৬-এর ল.সা.গু হলো ১২।
তাহলে:
১/৪ = ৩/১২
১/৬ = ২/১২
এখন দুটো অংশকে একই হরে দেখা যাচ্ছে। এই পদ্ধতি বড় হিসাবের সময় বিশেষ কাজে লাগে।
প্রয়োজনে ভগ্নাংশের হিসেব করতে
ভগ্নাংশ ক্যালকুলেটর
ব্যবহার করুন। তাহলে বিষয়টি আরোও সহজ হবে।
‘আওল’ বলতে কী বোঝায়?
কিছু ফারায়েজের ক্ষেত্রে নির্ধারিত অংশগুলো যোগ করলে মোট অংশ ১-এর বেশি হয়ে যেতে পারে। তখন সরাসরি প্রত্যেককে তার লিখিত ভগ্নাংশ অনুযায়ী সম্পূর্ণ দেওয়া সম্ভব হয় না। ফারায়েজের পরিভাষায় এমন পরিস্থিতির সঙ্গে
আওল সম্পর্কিত।
এ ধরনের হিসাব সাধারণ ভগ্নাংশের অঙ্কের চেয়ে বেশি সতর্কতার দাবি রাখে। তাই বাস্তব সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে শুধু একটি উদাহরণ দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে পুরো উত্তরাধিকারী তালিকা যাচাই করা উচিত।
‘রাদ’ কী?
অন্যদিকে কিছু পরিস্থিতিতে নির্ধারিত অংশ দেওয়ার পর সম্পত্তির কিছু অংশ অবশিষ্ট থাকতে পারে এবং সেই অবশিষ্ট অংশ কীভাবে যাবে, সেটিও ফারায়েজের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের অবস্থায়
রাদ-এর নিয়ম প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
তবে রাদ কার ক্ষেত্রে কীভাবে প্রযোজ্য হবে, সেটি উত্তরাধিকারীদের নির্দিষ্ট সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করে। তাই শুধু শব্দের অর্থ জানা যথেষ্ট নয়; কোন উত্তরাধিকারী জীবিত আছেন সেটিও দেখতে হবে।
একটি পূর্ণ উদাহরণ দিয়ে পদ্ধতিটি বুঝুন
ধরা যাক, একজন মুসলিম ব্যক্তি মৃত্যুকালে স্ত্রী, বাবা, মা, ২ ছেলে এবং ১ মেয়ে রেখে গেলেন। দাফন-কাফনের প্রয়োজনীয় খরচ, দেনা এবং প্রযোজ্য অন্যান্য বিষয় নিষ্পত্তির পর বণ্টনযোগ্য সম্পত্তির মূল্য ধরা হলো ২৪ লাখ টাকা।
এখন সরাসরি ২৪ লাখ টাকা ৫ জনের মধ্যে ভাগ করা যাবে না। কারণ প্রত্যেকের অংশ সমান নয় এবং স্ত্রী, বাবা ও মায়ের অবস্থানও সন্তানের অংশের সঙ্গে এক নয়।
হিসাবের কাঠামো হবে:
- প্রথমে নিশ্চিত করতে হবে ২৪ লাখ টাকাই বণ্টনযোগ্য নিট সম্পত্তি।
- এরপর জীবিত উত্তরাধিকারীদের সম্পর্ক লিখতে হবে।
- স্ত্রীর নির্ধারিত অংশ কোন পরিস্থিতিতে কত হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে।
- বাবা ও মায়ের প্রাপ্য অংশ নির্ধারণ করতে হবে।
- এরপর অবশিষ্ট অংশ থাকলে সন্তানদের মধ্যে প্রযোজ্য নিয়মে ভাগ করতে হবে।
- সন্তানদের মধ্যে ছেলে ও মেয়ের অংশের অনুপাত প্রয়োগ করতে হবে।
- শেষে সব অংশ যোগ করে মোট ২৪ লাখ টাকার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।
এই উদাহরণের উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট পরিবারের চূড়ান্ত অংশ ঘোষণা করা নয়। বরং এখান থেকে বোঝা যায়, ফারায়েজে “কত টাকা আছে” জানার পাশাপাশি “কারা জীবিত আছেন”—এই তথ্যটি কেন অপরিহার্য।
হাতে হিসাব করার আগে উত্তরাধিকারীর তালিকা বানান
বাস্তবে ফারায়েজের হিসাব করতে বসলে প্রথমে একটি তালিকা তৈরি করলে ভুল অনেক কম হয়। আপনি চাইলে এই ছকটি কাগজে কপি করে নিতে পারেন:
| উত্তরাধিকারী |
জীবিত কি না |
মৃতের সঙ্গে সম্পর্ক |
অন্য উত্তরাধিকারীর প্রভাব |
| স্বামী/স্ত্রী |
হ্যাঁ/না |
দাম্পত্য সম্পর্ক |
সন্তান ও অন্যান্য উত্তরাধিকারীর উপস্থিতি দেখতে হবে |
| বাবা |
হ্যাঁ/না |
পিতা |
পরিবারের কাঠামোর ওপর প্রভাব পড়তে পারে |
| মা |
হ্যাঁ/না |
মাতা |
পরিবারের কাঠামোর ওপর প্রভাব পড়তে পারে |
| ছেলে |
সংখ্যা লিখুন |
পুত্র |
মেয়ের সঙ্গে বণ্টনের অনুপাত বিবেচ্য |
| মেয়ে |
সংখ্যা লিখুন |
কন্যা |
ছেলে ও অন্যান্য উত্তরাধিকারীর উপস্থিতি দেখতে হবে |
| ভাই/বোন |
সংখ্যা লিখুন |
সহোদর/বৈমাত্রেয় সম্পর্ক যাচাই |
কাছের উত্তরাধিকারীর উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ |
উত্তরাধিকারীর সংখ্যা ভুল লিখলে কী সমস্যা হবে?
ফারায়েজের ক্ষেত্রে একজন উত্তরাধিকারী যোগ বা বাদ পড়লেও পুরো হিসাব বদলে যেতে পারে। যেমন একজন ছেলে থাকার কথা অথচ হিসাবের সময় তাকে বাদ দেওয়া হলো—তাহলে শুধু তার অংশই নয়, অন্য উত্তরাধিকারীদের অংশের হিসাবও ভুল হতে পারে।
একই কারণে “আমার মনে হয় উনি উত্তরাধিকারী নন”—এই ধরনের অনুমানের ওপর হিসাব করা ঠিক নয়। জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, পারিবারিক সম্পর্ক এবং প্রয়োজনীয় দলিল দেখে তথ্য নিশ্চিত করা ভালো।
হিসাব দ্রুত যাচাই করার উপায়
আপনি যদি হাতে ফারায়েজের অঙ্ক অনুশীলন করতে চান, আগে কাগজে উত্তরাধিকারীদের তালিকা তৈরি করুন এবং তাদের সম্পর্ক লিখুন। এরপর প্রযোজ্য অংশগুলো ভগ্নাংশে বসিয়ে হিসাব করুন।
আপনার হাতে করা হিসাবটি আরেকবার যাচাই করার জন্য
উত্তরাধিকার ক্যালকুলেটর ব্যবহার করতে পারেন। এতে আলাদা করে বড় অঙ্ক হাতে বসানোর আগে আপনার তৈরি হিসাবের সঙ্গে ফলাফল মিলিয়ে দেখা সহজ হবে। তবে ক্যালকুলেটরের ফলাফলকে বাস্তব সম্পত্তি বণ্টনের চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত হিসেবে না দেখে যাচাইয়ের সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করাই নিরাপদ।
জমি থাকলে কি হিসাবের পদ্ধতি বদলে যায়?
জমি, বাড়ি, ব্যাংকের টাকা বা নগদ অর্থ—সম্পত্তির ধরন আলাদা হলেও উত্তরাধিকারীর প্রাপ্য অংশ নির্ধারণের মূল প্রশ্ন হলো মৃত ব্যক্তির মালিকানাধীন বণ্টনযোগ্য সম্পত্তি কতটুকু এবং কারা উত্তরাধিকারী।
তবে জমি বা বাড়ির ক্ষেত্রে বাস্তব বণ্টন করতে গেলে শুধু ভগ্নাংশ জানলেই কাজ শেষ হয় না। জমির পরিমাণ, খতিয়ান, দলিল, দখল, যৌথ মালিকানা এবং প্রযোজ্য ভূমি আইনসহ অন্যান্য বিষয়ও সামনে আসে। ফলে “১/৪ অংশ” জানার পর সেই অংশ কোন জমির কোন অংশে কীভাবে বাস্তবে বণ্টন হবে, সেটি আলাদা প্রশাসনিক ও আইনি বিষয়।
ব্যাংকের টাকা থাকলে?
ব্যাংকে থাকা টাকা মৃত ব্যক্তির সম্পদের অংশ হলে উত্তরাধিকার হিসাবের সময় সেটিও বিবেচনায় আসতে পারে। কিন্তু ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কার নাম আছে, নমিনি কে, টাকা যৌথ অ্যাকাউন্টে কি না—এসব বিষয়ের সঙ্গে উত্তরাধিকার অধিকারের প্রশ্ন এক করে দেখা উচিত নয়।
বিশেষ করে নমিনি থাকা মানেই নমিনি ব্যক্তি সব ক্ষেত্রে চূড়ান্ত মালিক হয়ে গেলেন—এমন সরল সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। ব্যাংকিং প্রক্রিয়া এবং উত্তরাধিকার অধিকারের বিষয় আলাদাভাবে যাচাই করতে হয়।
নমিনি আর উত্তরাধিকারী কি একই?
এই দুটো শব্দের অর্থ এক নয়। নমিনি সাধারণত কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে অর্থ বা সম্পদ গ্রহণের জন্য মনোনীত ব্যক্তি হতে পারেন। অন্যদিকে উত্তরাধিকারী নির্ধারিত হন প্রযোজ্য উত্তরাধিকার আইন ও বিধান অনুযায়ী।
তাই কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্টে একজন নমিনি থাকলেই ফারায়েজের পুরো সম্পত্তি তার হয়ে যাবে—এমন ধারণা থেকে হিসাব করা উচিত নয়।
ফারায়েজের হিসাব করতে গিয়ে যে ভুলগুলো বেশি হয়
১. সম্পত্তি দেখেই ভাগ শুরু করা: দেনা ও অন্যান্য প্রাথমিক বিষয় বাদ না দিয়ে সরাসরি ভাগ করা বড় ভুল।
২. শুধু ছেলে-মেয়ের সংখ্যা দেখা: বাবা, মা, স্বামী বা স্ত্রী জীবিত থাকলে হিসাবের কাঠামো বদলাতে পারে।
৩. সব আত্মীয়কে উত্তরাধিকারী ধরে নেওয়া: আত্মীয়তা থাকলেই প্রত্যেক ব্যক্তি অংশ পাবেন না।
৪. ভাই-বোনের হিসাব আগে করা: কাছের উত্তরাধিকারীর উপস্থিতি ভাই-বোনের অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে।
৫. ভগ্নাংশ যোগ না করা: প্রত্যেকের অংশ লিখে মোট কত হলো, শেষ পর্যন্ত তা যাচাই করা জরুরি।
৬. যৌথ সম্পত্তিকে পুরোটা মৃতের সম্পত্তি ধরে নেওয়া: মৃত ব্যক্তির প্রকৃত মালিকানার অংশ আগে নির্ধারণ করতে হবে।
৭. নমিনিকে উত্তরাধিকারী ধরে নেওয়া: নমিনি ও উত্তরাধিকারীর ভূমিকা এক নয়।
৮. মুখস্থ অংশকে সব পরিবারে প্রয়োগ করা: একই উত্তরাধিকারীর অংশও পারিবারিক পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে।
ফারায়েজ শেখার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি
ফারায়েজ শেখার সময় প্রথমে সব জটিল হিসাব মুখস্থ করার দরকার নেই। বরং কয়েকটি ধাপে অনুশীলন করুন।
- প্রথমে স্বামী/স্ত্রীসহ একটি সাধারণ পরিবার নিন।
- তারপর সন্তান যোগ করুন।
- এরপর বাবা-মা যোগ করুন।
- তারপর ভাই-বোন যোগ করে দেখুন কী পরিবর্তন হয়।
- প্রতিবার উত্তরাধিকারীদের তালিকা নতুন করে লিখুন।
- ভগ্নাংশের ল.সা.গু বের করে অংশগুলো একই হরে আনুন।
- শেষে টাকা বসিয়ে ফলাফল যাচাই করুন।
এভাবে অনুশীলন করলে ফারায়েজের হিসাবকে শুধু মুখস্থ বিষয় মনে হবে না; কোন পরিস্থিতিতে কোন ধাপ আগে দেখতে হয়, সেটাও পরিষ্কার হবে।
ফারায়েজের হিসাবের জন্য কী কী তথ্য লাগবে?
একটি পরিবারের উত্তরাধিকার হিসাব করতে সাধারণত অন্তত নিচের তথ্যগুলো আগে সংগ্রহ করা ভালো:
- মৃত ব্যক্তির মোট বণ্টনযোগ্য সম্পত্তি
- মৃত ব্যক্তির কোনো দেনা ছিল কি না
- প্রযোজ্য ওসিয়ত আছে কি না
- স্বামী বা স্ত্রী জীবিত আছেন কি না
- বাবা জীবিত কি না
- মা জীবিত কি না
- কতজন ছেলে জীবিত
- কতজন মেয়ে জীবিত
- ভাই-বোন কারা জীবিত
- কোনো ছেলে বা মেয়ে আগে মারা গেছেন কি না
- মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি একক মালিকানাধীন নাকি যৌথ
বিশেষ করে আগে মারা যাওয়া ছেলে বা মেয়ের সন্তান থাকলে বিষয়টি আলাদাভাবে যাচাই করা দরকার। বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৪ ধারায় predeceased son বা daughter-এর সন্তানদের জন্য বিশেষ উত্তরাধিকার বিধান রয়েছে।
বাংলাদেশে মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের বিষয়টি কেন আলাদা করে মনে রাখা দরকার?
বাংলাদেশে মুসলিমদের উত্তরাধিকার প্রশ্নে মুসলিম ব্যক্তিগত আইন প্রাসঙ্গিক। মুসলিম Personal Law (Shariat) Application Act, 1937-এর ২ ধারায় মুসলিমদের intestate succession বা উইল ছাড়া মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে মুসলিম ব্যক্তিগত আইন প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে, যদিও আইনে নির্দিষ্ট ব্যতিক্রমও রয়েছে।
এ কারণে ইন্টারনেটে অন্য দেশের উত্তরাধিকার আইন বা অন্য ধর্মের উত্তরাধিকার বিধান দেখে বাংলাদেশের মুসলিম পরিবারের হিসাব করা উচিত নয়। আইনগত বাস্তবতা, পারিবারিক পরিস্থিতি এবং প্রযোজ্য ব্যক্তিগত আইন মিলিয়ে বিষয়টি দেখতে হয়।
ফারায়েজ আর সম্পত্তি রেজিস্ট্রি কি একই বিষয়?
না। ফারায়েজ মূলত কে কত অংশের অধিকারী—এই প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু সেই অংশ বাস্তবে জমি বা বাড়িতে রূপান্তর করা, নামজারি করা, দলিল তৈরি করা, অংশ আলাদা করা বা দখল বুঝে নেওয়া আলাদা প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া।
উদাহরণ হিসেবে, কারও ফারায়েজি অংশ যদি কোনো জমির ১/৪ হয়, তার মানে এই নয় যে জমির চার কোণের যেকোনো একটি অংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার হয়ে গেল। বাস্তব বণ্টনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হতে পারে।
হিসাব শেষ করার পর একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা
সব উত্তরাধিকারীর অংশ নির্ধারণ করার পর হিসাবটি আবার যোগ করুন। আপনার হাতে যদি পুরো সম্পত্তির ১/২, ১/৪, ১/৮ ইত্যাদি অংশ থাকে, তাহলে সব অংশের সমষ্টি কী দাঁড়াচ্ছে তা পরীক্ষা করুন।
টাকার হিসাব হলে একই কাজ টাকায় করুন। ধরুন বণ্টনযোগ্য সম্পত্তি ২০ লাখ টাকা। শেষ হিসাবের পর সব উত্তরাধিকারীর প্রাপ্য টাকা যোগ করে ২০ লাখের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন। হিসাবের কোথাও টাকা কম বা বেশি হলে আগের ধাপে ফিরে যান।
এই শেষ যাচাইটি খুব ছোট একটি ধাপ হলেও বাস্তবে ভুল ধরার জন্য বেশ কাজে দেয়।
এক কথায় ফারায়েজ হিসাবের পুরো প্রক্রিয়া
ফারায়েজকে যদি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় নামিয়ে আনেন, তাহলে বিষয়টি এমন:
১. মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি শনাক্ত করুন → ২. তার প্রকৃত মালিকানার অংশ নির্ধারণ করুন → ৩. প্রয়োজনীয় দাফন-কাফনের খরচ বিবেচনা করুন → ৪. দেনা যাচাই করুন → ৫. বৈধ ওসিয়তের বিষয় দেখুন → ৬. জীবিত উত্তরাধিকারীদের তালিকা করুন → ৭. কোন উত্তরাধিকারী অংশ পাবেন এবং কার ওপর কার প্রভাব আছে তা নির্ধারণ করুন → ৮. নির্ধারিত অংশ হিসাব করুন → ৯. অবশিষ্ট অংশের নিয়ম প্রয়োগ করুন → ১০. সব অংশ যোগ করে হিসাব যাচাই করুন।
শেষ কথা
ফারায়েজ শেখার আসল বিষয় হলো শুধু কার কত অংশ—এই তালিকা মুখস্থ করা নয়। বরং একটি পরিবারের উত্তরাধিকারীদের অবস্থান দেখে সঠিক ক্রমে হিসাব করতে শেখা। একই ব্যক্তি এক পরিবারে উত্তরাধিকারী হতে পারেন, আবার অন্য পারিবারিক পরিস্থিতিতে তার অংশের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।
তাই হাতে-কলমে শেখার সময় প্রতিটি উদাহরণে প্রথমে উত্তরাধিকারীদের তালিকা করুন, তারপর প্রাথমিক দায় ও বণ্টনযোগ্য সম্পত্তি নির্ধারণ করুন এবং শেষে ভগ্নাংশের হিসাব করুন। নিজের করা হিসাব যাচাই করতে
উত্তরাধিকার ক্যালকুলেটর ব্যবহার করা যেতে পারে।
আর বাস্তবে জমি, বাড়ি, ব্যাংক হিসাব বা বড় অঙ্কের সম্পত্তি ভাগ করার ক্ষেত্রে শুধু অনলাইন হিসাবের ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজনীয় দলিলপত্রসহ অভিজ্ঞ আলেম এবং প্রয়োজনে আইনজীবী বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ ফারায়েজের একটি ভগ্নাংশের হিসাব আর সেই অংশ বাস্তবে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া—দুটো আলাদা বিষয়।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ সরকারের Laws of Bangladesh-এ প্রকাশিত Muslim Personal Law (Shariat) Application Act, 1937 এবং Muslim Family Laws Ordinance, 1961-এর সংশ্লিষ্ট বিধান।
সর্বশেষে হালনাগাদ করা হয়েছে: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মন্তব্য (0 টি)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!